দেশ টেলিভিশন লিমিটেড, কর্ণফুলী মিডিয়া পয়েন্ট, ৪২, শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীন সড়ক, মালিবাগ, ঢাকা-১২১৭, বাংলাদেশ।
টেলিফোন: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৫৮, ৮৩৩২৯২২ ফ্যাক্স: +৮৮ (০২) ৮৩৩২৯৮১ মেইল: [email protected]

হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ ব্যবহার নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। বাহিনীটি বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে সতর্ক করে বলেছে, তেহরানের অনুমোদিত পথ ছাড়া অন্য কোনো রুট ব্যবহার করা যাবে না।
ওমান বুধবার হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে নতুন একটি জাহাজ চলাচল করিডর চালুর ঘোষণা দেওয়ার পর এ সতর্কবার্তা আসে। ওমান জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করেই নতুন রুট নির্ধারণ করা হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের অচলাবস্থার পর ধীরে ধীরে প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের পর এই ইস্যু নতুন করে সামনে এসেছে। চার মাসব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংঘাত কার্যত বন্ধের পাশাপাশি ওই সমঝোতার মাধ্যমে ৬০ দিনের আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যার লক্ষ্য একটি বিস্তৃত শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানো।
সমঝোতা স্মারকের আগে কয়েক মাস ধরে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত ছিল। ইরান কার্যত প্রণালিটি বন্ধ করে দেয় এবং এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়েই বর্তমানে প্রণালিকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছে। তবে ভবিষ্যতে জাহাজ চলাচলের ওপর ইরান অধিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে কি না, ৬০ দিনের আলোচনার পর কোনো ধরনের যাতায়াত ফি আরোপ করবে কি না এবং এ নিয়ে মতবিরোধ স্থায়ী চুক্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে কি না—এসব প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাধারণ সময়ে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ পরিবহন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়েছে।
ইরানের দাবি, নতুন নৌপথ ঘোষণার আগে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ বা সমন্বয় করা হয়নি। বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বলেছে, প্রস্তাবিত রুট গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে বাহিনীর নৌ ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এপ্রিল মাসে ইরান নিজস্বভাবে অনুমোদিত রুটের মানচিত্র প্রকাশ করেছিল, যেখানে জাহাজগুলোকে আগের তুলনায় ইরানি উপকূলের অনেক কাছ দিয়ে চলাচলের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজ ওমানের উপকূলঘেঁষা নতুন রুট ব্যবহার করে প্রণালি অতিক্রম করার পর পরিস্থিতি আরও আলোচনায় আসে।
ওমান নতুন করিডরের পক্ষে অবস্থান নিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন মেনে নিরাপদ নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আলবুসাইদি বলেছেন, ভবিষ্যতে প্রণালি ব্যবহারে কোনো ধরনের যাতায়াত ফি আরোপের পরিকল্পনা নেই।
সমঝোতা স্মারকে ইরান ৬০ দিনের জন্য পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরের মধ্যে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ ও বিনা খরচে চলাচল নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে ওই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর কী হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই।
আন্তর্জাতিক আইনে সাধারণত আন্তর্জাতিক প্রণালির মধ্য দিয়ে জাহাজ চলাচলের অধিকার সুরক্ষিত। ফলে এককভাবে কোনো উপকূলীয় রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক নৌপথে চলাচলের ওপর ফি আরোপ করা কঠিন।
তবে গত সপ্তাহে ইরান জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলাকালে ৬০ দিনের জন্য পরিকল্পিত ফি মওকুফ রাখা হবে। এতে আলোচনার সময়সীমা শেষ হওয়ার পর নতুন ফি আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, আন্তর্জাতিক জলপথে কোনো দেশ টোল বা ফি আরোপ করতে পারে না। তিনি দাবি করেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যেও এ ধরনের পদক্ষেপের কোনো সমর্থন নেই।
অন্যদিকে ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, হরমুজ প্রণালি আর কখনো যুদ্ধপূর্ব অবস্থায় ফিরবে না।
যুদ্ধের পর ধীরে ধীরে জাহাজ চলাচল শুরু হলেও তা এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি। সংঘাত শুরুর আগে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এ পথ ব্যবহার করত। বর্তমানে মাইন অপসারণ কার্যক্রম চলার মধ্যে বুধবার পর্যন্ত ৭০টি জাহাজ চলাচলের তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে তেলের দামও কমতে শুরু করেছে। বৃহস্পতিবার বৈশ্বিক মানদণ্ডের অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ দশমিক ২৪ ডলারে নেমে আসে। যদিও তা যুদ্ধ শুরুর আগের ৬৬ ডলারের চেয়ে বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা ছাড়াও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং জব্দকৃত সম্পদ ফেরত দেওয়ার মতো বিষয়গুলো এখনো আলোচনার প্রধান বাধা হয়ে রয়েছে। ফলে ৬০ দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
/অ